20 Jan, 2026 at 5:34 AM Md Ahasanur Rahman

ফিজিওলজি এবং মেডিসিনে নোবেল প্রাইজ ২০২৫

ফিজিওলজি এবং মেডিসিনে নোবেল প্রাইজ ২০২৫ পাওয়া বিজ্ঞানীদের গল্প ফেইসবুকে বেশ সাড়া ফেলেছে। এটি বেশ উৎসাহ ব্যঞ্জক। আজে বাজে আলাপের চাইতে এই রকম নিউজ/আলোচনা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জরুরী ।

ফিজিওলজি এবং মেডিসিনে নোবেল প্রাইজ ২০২৫ পাওয়া বিজ্ঞানীদের গল্প ফেইসবুকে বেশ সাড়া ফেলেছে। এটি বেশ উৎসাহ ব্যঞ্জক। আজে বাজে আলাপের চাইতে এই রকম নিউজ/আলোচনা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জরুরী ।

যাইহোক, এই তিন বিজ্ঞানীর কথা সবাই জেনেছি, তারা কি কাজের জন্য পেলেন সেটিও জেনেছি। আমি বরং জানাই সেই কাজের ইতিহাস। কিভাবে তারা সেই যুগান্তকারী আবিষ্কার করলেন। তাদের আবিষ্কারের আর্টিকেলগুলোও দিলাম ।

 

 

ঘটনার শুরু ১৯৫০ সালের দিকে যখন বারমিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর Peter Brian Medawar ও তাঁর সহকর্মীরা (Rupert Billingham এবং Leslie Brent) পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ করেন যে যদি ভ্রূণ বা নবজাতক ইঁদুর-এর শরীরে অন্য জাতের ইঁদুরের প্লীহা বা spleen cell ইনজেকশন করা হয়, তবে বড় হয়ে ওঠার পর সেই গ্রহীতা ইঁদুর দাতা ইঁদুরের ত্বক প্রতিস্থাপন (skin graft) কে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে অর্থাৎ গ্রহীতার শরীরের কোন রিজেকশন বা প্রতিক্রিয়া হয় না। সহজ ভাষায় ইঁদুরের শরীর ভ্রূণ অবস্থায় যেসব কোষের সঙ্গে পরিচিত হয় তাদেরকে সে “নিজের” অংশ হিসেবে মানতে শেখে। তাঁদের এই এক্সপেরিমেন্ট প্রমাণ করে যে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ বা ইমিউন সিস্টেম জন্মগতভাবে ‘প্রোগ্রামড’ নয়, বরং জন্মের পর (বাচ্চারা যেভাবে শেখে ) শিখে ফেলে কে "নিজের বা আপন " আর কে "পর"। এই প্রসেসটি কে বলা হয় একোয়ার্ড ইমিউনো টলেরেন্স (acquired immunological tolerance)। এই ধারণাই ভবিষ্যতের প্রতিস্থাপন চিকিৎসার ভিত্তি গড়ে দেয়। এই গবেষণার জন্য Medawarজ ও Burnet 1960 সালে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁদের কাজের সূত্র ধরেই পরে অঙ্গ প্রতিস্থাপন (organ transplantation) এবং অটোইমিউন রোগে টলারেন্স পুনঃস্থাপন সম্ভব হয়।


 

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ হলেই তো কথাই ছিলনা। এই ঐতিহাসিক এক্সপেরিমেন্টের উপর ভিত্তি করে পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানীরা খুঁজতে থাকেন আমাদের শরীর কিভাবে এই টলারেন্স ধরে রাখে-যাকে বলা হয় ইমিউনো টলারেন্স ? আর সারাজীবনই বা কিভাবে আমাদের শরীর কোন কোষ "আপন" বা কে "পর" এই রীতি মেনে চলে? তার আগে জানিয়ে রাখি আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম "মূলত" শ্বেত রক্তকণিকা বা T সেলের উপর নির্ভর করে । প্রতিটি T সেলের আবার নিজস্ব রিসেপ্টর থাকে, যা সাধারণত জীবাণু বা বাইরের কোন কোষ অথবা শরীরের ক্ষতিকর কোষকে শনাক্ত করে এবং ধ্বংস করে। কিন্তু এই রিসেপ্টর তৈরির প্রক্রিয়ায় কিছু T সেল ভুলক্রমে শরীরের নিজের কোষকে (self -recognizing) শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলে । এদের কে বলা হয় সেলফ রিএক্টিং (self -reacting) আর যদি এই ক্ষতিকারক টি সেলগুলো শরীরে বেড়ে যায়, তখন তারা নিজের শরীরের টিস্যু সহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে—যাকে ডাক্তারি ভাষায় বলে অটো ইমিউনো ডিজিজ ( autoimmune disease)।


 

তো, নব্বইয়ের দশকের আগে পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা জানতেন শরীর central tolerance নামের এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেক self-reactive T সেলকে তাঁদের উতপত্তি স্থল আমাদের বুকের মাঝখানে থাইমাস নামক ছোট একটি অঙ্গে ধ্বংস করে দিতে পারে । কিন্তু কিভাবে করে সেই মেকানিজম জানা ছিলনা । সেই সময় জাপানের তরুণ গবেষক Dr. Shimon Sakaguchi (যিনি তখন Aichi Cancer Center Research institute-এ গবেষণারত ছিলেন ) প্রথম দেখালেন যে জন্মের পরপরই যদি কোন ইঁদুরের থাইমাস কেটে ফেলে দেয়া হয়, তারা অল্পদিনেই ভয়ংকর অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেইসব ইঁদুরের মধ্যে সুস্থ অন্য ইঁদুরের T cell ইনজেকশন করে দেয়া হয় তাহলে আবার তারা আর অসুস্থ হয় না। অর্থাৎ তাঁদের অটোইমিউন রোগ হয়না । তার অর্থ ইঞ্জেক্ট করা T সেলগুলোতে নিশ্চয়ই কিছু আছে যা এই সেলফ এটাকিং T সেলগুলোকে প্রতিহত করতে পারে। সেই রহস্যের কিনারা খুঁজছিলেন জাপানের এই বিজ্ঞানী । ১৯৯৫ সালে তিনিই প্রথম দেখাতে সক্ষম হন যে ইনজেক্ট করা কিছু টি সেল আসলে শরীরের ইমিউন সিস্টেমে “প্রহরীর ভূমিকা” পালন করছে—যারা T সেলের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোকে মনিটর ও কনট্রোল করে এর ভারসাম্য বজায় রাখে। আর এগুলো হল CD25 নামের এক প্রোটিন বহনকারী একটি বিশেষ শ্রেণির টি সেল—যাদের তিনি নাম দিলেন regulatory T cell বা সংক্ষেপে T-reg। কিন্তু T-reg সেলগুলো কিভাবে এই কাজ করে ? সেই দারূন গল্পটিই বলি এবার।


 

ঠিক একই সময়ে ওয়াশিংটন স্টেইট এর Dr Fred Ramsdell ও তার সহকর্মী Mary Brunkow ( দুজনেই Celltech Chiroscience-এর গবেষক) কাজ করছিলেন এক অদ্ভুত মাউস মিউট্যান্ট নিয়ে । এই মাউসের ত্বক খসখসে , প্লীহা ও লিম্ফ নোড ফুলে যায়, এবং বেশি দিন বাঁচেনা । আরও অদ্ভুত ব্যাপার—এই রোগটি দেখা যায় শুধুমাত্র পুরুষ মাউসে। অর্থাৎ, এটি কোনো X chromosome-সংক্রান্ত জেনেটিক ত্রুটির ফল। ২০০১ সালে তাঁরা খুঁজে পেলেন এই রোগের উৎস হলো Foxp3 নামের একটি নতুন জিন (forkhead/winged-helix transcription factor )। তারা দেখালেন মাত্র দুই বেস পেয়ার ইনসারশন মিউটেশন অর্থাত এই জিনের কোডিং সিকোয়েন্সে দুটি বেশি নিউক্লিওটাইড যুক্ত হলে একটি অকার্যকর প্রোটিন তৈরি হয় এবং ইঁদুরের শরীরের টি সেলগুলো হয়ে ওঠে মারাত্মক সেলফ রিএক্টিভ -যেটা আগেই বলেছি । এর অর্থ এই প্রওটিনের কারণেই T সেলগুলো নিয়ন্ত্রণে থাকত ইঁদুরের শরীরে । তারা এই মিউটেশন থাকা প্রোটিনের নাম দিলেন scurfin আর ইঁদুরের নাম দিলেন স্কার্ফি মাউস (scurfy mouse )। Brunkow ও Ramsdell পরে মানুষের কোষ নিয়ে গবেষণা করে দেখান যে মানুষের ক্ষেত্রেও একই জিনে মিউটেশন ঘটলে জন্ম নেয় ভয়ংকর IPEX syndrome। এই রোগে শিশুদের ত্বকে র‍্যাশ, অন্ত্র ও অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহ, এবং অল্প বয়সেই মৃত্যুর আশঙ্কা দেখা দেয়।


 

অন্যদিকে ২০০৩ সালে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে সাকাগুচির দল Foxp3-র কার্যকর ভূমিকা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা যায়, Foxp3 জিন শুধুমাত্র regulatory T cell-এই প্রকাশিত হয়, এবং এই জিন সক্রিয় থাকলেই কেবল টি সেলগুলো নিজের কোষগুলোকে আক্রমণ করেনা । গবেষণায় তাঁরা আরও দেখান যে Foxp3 প্রধানত থাইমাস ও পেরিফেরিতে স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন হওয়া CD25⁺ T-reg কোষগুলোতেই থাকে । অর্থাৎ Foxp3 আসলে একটি “master regulatory gene”, যা থাইমাস ও পেরিফেরি—উভয় জায়গায় regulatory T cell-এর কার্যক্রম মনিটর এবং কি কাজ করবে সেটা নির্ধারণ করে। তাঁরা আরও প্রমাণ করেন, Foxp3 জিনে মিউটেশন ঘটলে মাউস ও মানুষের দেহে প্রাণঘাতী lymphoproliferative রোগের সৃষ্টি হয়।


 

মজার ব্যাপার হল Foxp3 কৃত্রিমভাবে সাধারণ T সেল -এ প্রবেশ করালে, সেই কোষগুলোও T-reg সেলের মত আচরণ করতে শুরু করে। অর্থাৎ, Foxp3 হলো সেই “master transcription factor” যা একটি সাধারণ টি সেলকে “ইমিউন পুলিশের” ভূমিকায় পরিণত করে।

সায়েন্স ইজ এ রিলে রেইস। এভাবে প্যাসিফিকের দুই প্রান্তে দুটি পৃথক গবেষণা—Brunkow ও Ramsdell-এর জেনেটিক আবিষ্কার এবং Sakaguchi-র কার্যকরী বিশ্লেষণ এক জায়গায় এসে জন্ম দিল যুগান্তকারি এক আবিষ্কার । জন্ম নিয়েছে আধুনিক Foxp3–Treg paradigm, যা ইমিউনোলজির ইতিহাসে এক অসাধারন অধ্যায়। বলা হচ্ছে T-reg সেলগুলো আমাদের ইমিউন সিস্টেমের ব্রেক। আমরা যখন ব্রেক নিয়ন্ত্রণে রাখি , তখন ইমিউন প্রতিক্রিয়া বাড়ানো বা কমানো—দুটোই সম্ভব।


 

এই আবিষ্কারের উপর ভর করে এখন সারা দুনিয়ায় চলছে ২০০-রও বেশি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল যেখানে Foxp3-পজিটিভ Treg কোষকে ব্যবহার করা হচ্ছে টাইপ ১ ডায়াবেটিস, লুপাস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস—এইসব অটোইমিউন রোগে আক্রান্তদের রোগ নিয়ন্ত্রণে। Eli Lilly, Celgene, এবং Sonoma Biotherapeutics (র‍্যামসডেলের সহ-প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি) ইতোমধ্যেই কাজ করছে অঙ্গ প্রতিস্থাপনে ইমিউন সহনশীলতা তৈরি ও graft-versus-host disease-এর মতো জটিল রোগের চিকিৎসায়।

হোয়াট এ টাইমলি নোবেল প্রাইজ ইট ইজ !


 

বাই দ্যা ওয়ে -- Brunkow ও Ramsdell কিন্তু কখনোই একাডেমিক পজিশনে ছিলেন না। তারা বায়োটেক এ কাজ করতেন । অন্যদিকে নোবেল কমিটি এখনো Dr Ramsdell কে অভিনন্দন জানাতে পারেন নি কারণ উনি আইডাহোর এক মাউন্টেইন এ হাইকিং এ আছেন ....